ইসলামের অপব্যাখ্যা: পরিচিতি ও প্রতিকার


মুফতী আবদুল্লাহ নাজীব হাফিযাহুল্লাহ
(১ম পর্ব)
ইসলামের ব্যাখ্যা: সংকট ও উত্তরণ


যুগে যুগে ইসলামের মূলনীতি ও আদর্শ এবং ইসলামের মুখ্যচতনাকে ভিন্নপথে পরিচালিত করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। কখনো বিকৃতি করা হয়েছে ইসলামের মূল ভাবনাকে; কখনোবা কুরআন-সুন্নাহর কোনো অকাট্ট বিধানকে। ইসলামকে দেখা হয়েছে নিজ নিজ লেন্স দিয়ে। বিচার ও ব্যাখ্যা করা হয়েছে নিজ বিবেক-বুদ্ধির আলোকে। উদ্ভাবন করা হয়েছে নতুন নতুন মানহাজ ও মেথডোলজি।  
অপব্যাখ্যার এ ভয়াল স্রোত আবারও বেগবান হতে চলেছে। নানা মহল থেকে ইসলামের নতুন নতুন বয়ান হাজির করা হচ্ছে। ইসলাম এমন নয় বরং তেমন; এরকম নয় বরং সেরকম— এমন বিচিত্র পন্থায় চলছে অপব্যাখ্যার কারসাজি ও কর্মকান্ড। এ কর্মকান্ডে মদদ দিচ্ছে মুক্তচিন্তা, বাকস্বাধীনতা, আধুনিকতা, প্রগতিশীলতা ইত্যাদি ভাবনা। অনলাইনে সবারই স্থান আছে। সুযোগ আছে কথা বলার। মত প্রকাশের। ব্যাখ্যা দেওয়ার। বিভিন্ন মহল এই সুযোগ লুফে নিচ্ছে। নতুন পোশাকে ইসলামকে হাজির করছে। 


সবই হচ্ছে ইসলাম ও দাওয়াহর নামে। কুরআন স্টাডি ও হাদীসের আলোর শিরোনামে। এতে মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছে। ধোঁয়াশা সৃষ্টি হচ্ছে। সংশয় তৈরি হচ্ছে ইসলাম ও ইসলামী মূল্যবোধের প্রতি। কেউ কেউ তো নতুন ব্যাখ্যা পেয়ে পথভ্রষ্ট হচ্ছেন। নিজের চিরচেনা ইসলামকেই নবায়ন করছেন। পরিস্থিতি যে কতটা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে তা আর ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। বিশেষত অনলাইনে আক্রান্ত ভাইদের ভাষ্য, একেক ক্লিকে যেন একেকটি নতুন ইসলাম আবিষ্কৃত হচ্ছে। একেক দাঈ একেক দিকে ডাকছেন। একেক ঘরানার একেক ব্যাখ্যায়। যাদের ভাষা ও পরিভাষাও ভিন্ন ভিন্ন। আন্দায ও ভঙ্গিও পৃথক পৃথক। যেন এক ইসলামের একাধিক ভার্সন! এখন আমরা কী করবো?


এ সংকট থেকে উত্তরণ পেতে হলে আমাদের ইসলামের সঠিক ব্যাখ্যা জানতে হবে। জানতে হবে সেই সঠিকের সঠিকতা। ইসলামকে পড়তে হবে। ইসলাম নামক ঘরকে শুধু ভেতর থেকে দেখলেই হবে না। বরং বাইর থেকেও দেখতে হবে। আমরা যারা মাদরাসায় লেখাপড়া করি; আমরা সাধারণত স্বতন্ত্ররূপে ফিকহ পড়ি; হাদীস পড়ি; কুরআনও পড়ি। এ সবই ইসলামের ভেতরের জিনিস। কিন্তু ইসলামকে স্বতন্ত্র বিষয়রূপে পড়ি না। অনেকটা এমন যে, ঘরের ভিতরে আসবাবপত্র সম্পর্ক তো অনেক পড়াশোনো আছে। কিন্তু মূল ঘরটাকেই ভালভাবে জানি না। যার কারণে ইসলাম কী চায়? ইসলাম কেন অপরিহার্য? ইসলামের মুখ্য চিন্তা ও চেতনা কি? ইত্যাদি প্রশ্নের গোছালো উত্তর আমাদের কাছে থাকে না। বুঝেও উঠতে পারি না যে, কী বলতে হবে আর কী বলা যাবে না। সঠিক ব্যাখ্যা মাথায় না থাকায় কে সঠিক বলছেন আর কে বেঠিক বলছেনÑ তা অনুধাবন করতে পারি না। তাই সময় এসেছে ইসলামকে জানার। স্বতন্ত্র বিষয়রূপে ভাবার। ব্যাখ্যার মানদণ্ড ও মানহাজ যথাযথরপে রপ্ত করার। তবে আমরা অপব্যাখ্যাকে রোধ করতে সক্ষম হবো।


ইসলামের ব্যাখ্যা বলে কী বুঝানো হয়েছে? 
ইসলামের ব্যাখ্যা এ শব্দটির একাধিক প্রয়োগ রয়েছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রেই আমরা এ শব্দটি ব্যবহার করে থাকি। বক্ষমাণ আলোচনায় সকল ব্যবহার উদ্দিষ্ট নয়। বিষয়টি প্রথমেই খোলাসা হওয়া প্রয়োজন। 
ইসলামের ব্যাখ্যা বলে কখনো আমরা ইসলামের কোনো বিধানের ব্যাখ্যা বুঝিয়ে থাকি। আমরা জানি ইসলামী শরীয়াহ জীবনময়। সার্বজনীন। ইসলামের অসংখ্য বিধান রয়েছে। প্রতিটি বিধানের নিজস্ব প্রকৃতি ও গতিপথ রয়েছে। ব্যাখ্যার জন্য রয়েছে সুনির্দিষ্ট নিময়কানুন। যেমন: সালাত, যাকাত, সিয়াম এর অজস্র বিধান রয়েছে। প্রতিটি বিধান সাব্যস্ত করার এবং ব্যাখ্যা করার সুনির্দিষ্ট নিয়মকানুন রয়েছে। যে ব্যাখ্যা সেই উসূল ও নিয়মমাফিক হবে তা স্বীকৃত ও গৃহিত হবে। আর যে ব্যাখ্যা সেই উসূল ও নিয়ম লঙ্ঘিত হবে তা পরিত্যজ্য বিবেচিত হবে। 
ইসলামের ব্যাখ্যা বলে কখনো আমরা ‘নস’ তথা কুরআন ও হাদীসের ভাষ্যের ব্যাখ্যা বুঝিয়ে থাকি। কুরআনের কোনো একটি আয়াত এবং হাদীসের কোনো একটি অংশের ব্যাখ্যাও ইসলামেরই ব্যাখ্যা। এ ক্ষেত্রটিও নানাভাবে অপব্যাখ্যার শিকার হয়েছে। এ সকল অপব্যাখ্যাকে রোধ করার জন্য উলামায়ে কেরাম উসূলুল ফিকহ ও উসূলুদ দালালাহ নামক শাস্ত্র উদ্ভাবন করেছেন। 
ইসলামের ব্যাখ্যা বলে কখনো আমরা আকীদার কোনো একটি বিষয়ের ব্যাখ্যাও বুঝিয়ে থাকি। আকীদাহর নিজস্ব ব্যাখ্যা রয়েছে। আছে নিয়মকানুন। তা সত্ত্বেও ইসলামী আকীদা অপব্যাখ্যার শিকার হয়েছে। আকীদার ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে সাধারণ মুসলিমদের বিভ্রান্ত করার প্রয়াস চালানো হয়েছে। তবে উলামায়ে কেরাম ছিলেন সচেতন ও সরব। যখনই কেউ কোনো আকীদাকে অস্বীকার করেছে বা আকীদার অপব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছে উলামায়ে কেরাম তৎক্ষণাত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। দুষ্কৃতিকারীেেদর অপব্যাখ্যা ও অপকর্মকে রুখে দিয়েছেন। মানুষকে সচেতন করেছেন। 
বক্ষমাণ আলোচনায় এ তিন প্রকার ব্যাখ্যার কোনোটিই উদ্দেশ্য নয়। এ তিনও প্রকারের ব্যাখ্যা হলো ইসলামের নির্দিষ্ট অংশ বা খণ্ডাংশের ব্যাখ্যা। গোটা ইসলামের ব্যাখ্যা নয়। এখানে ইসলামের ব্যাখ্যা দ্বারা বুঝানো হয়েছে ইসলামের মুখ্যচেতনার ব্যাখ্যা। আরবীতে এভাবে বলা যায়:


تفسير طبيعة الإسلام/ تفسير الذاتية المميزة للإسلام/ تفسير المفاهيم المركزية للإسلام

ইসলামের একটি সত্তা রয়েছে। আছে মুখ্যচেতনা। আল্লামা আবুল হাসান নাদাবী রহ. সুন্দরই বলেছেন:


إن لكل كائن حي طبيعة خاصة، وسمات بارزة، وملامح مميزة، يتكون منها واقع يعبر عنه بالشخصية أو الذاتية المميزة، ويستوي في ذلك الأفراد والجماعات، والشعوب والأمم، والديانات والفلسفات، فما هي شخصية هذا الدين، وذاتيته المميزة؟ يجب علينا أن نعرف ذلك


‘প্রত্যেকটি জীবন্ত বস্তুর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কিছু দৃশ্যমান লক্ষণ রয়েছে। এবং আছে বিশিষ্টতাদানকারী এমন কিছু দিক, যার মাধ্যমে কোনো একটি ঘটনা অথবা বাস্তবতা তৈরি হয় যাকে ব্যক্ত করা হয় ব্যক্তিত্ব বা স্বতন্ত্র সূচক সত্তা ধারা। আর এক্ষেত্রে ব্যক্তি ও দল, জনগোষ্ঠী ও জাতি, ধর্ম ও দর্শনÑ সব সমান। সুতরাং ব্যক্তিত্ব ও স্বতন্ত্র সূচক সত্তা কী? তা আমাদের তা জানতে হবে।’ (আল-আকীদাহ ওয়াল ইবাদাহ পৃ. ২৩) 


বিষয়টি একটু ভিন্নরূপে বোঝার চেষ্টা করি। ইসলাম কী চায়? ইসলামের দাবি কী? ইসলামের মেযাজ ও প্রকৃতি কী? ইসলামের মূল চিন্তা ও কেন্দ্রিয় চেতনা কী? ইসলামের রোখ ও ঝোঁক কোন দিকে? কোন দিকে তার গতি ও স্রোত? ইত্যাদি প্রশ্ন যদি করা হয় অথবা যদি বলা হয় যে, এক মিনিটে ইসলামের মূল পরিচয়টা তুলে ধরেন, তাহলে আপনি কী বলবেন বা বলার প্রয়াস চালাবেন? নিশ্চয়ই আপনি সেই বিষয়গুলো খুঁজবেন এবং বলার চেষ্টা করবেন যা কুরআন-হাদীসের নির্যাস হবে; ইসলাম নিংড়ানো ভাবনা হবে। আপনি এমন কিছু কথা বলার চেষ্টা করবেন যা গোটা ইসলামের প্রতিনিধিত্ব করবে। ইসলামের প্রকৃত রূপ তুলে ধরবে। সেই কাক্সিক্ষত ভাবনাই হলো ইসলামের মুখ্যচেতনা। যা ইসলামের পরতে পরতে মিশে আছে। কুরআন-হাদীসের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ডুবে আছে। কুরআনুল কারীমের প্রতিটি শব্দ প্রতিটি আয়াত প্রতিটি সূরা এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতিটি হাদীস সেই চেতনা ধারণ করছে এবং প্রকাশ করছে। ইসলামকে বুঝতে হলে এবং ইসলামকে ব্যাখ্যা করতে হলে প্রথমে সেই মুখ্যচেতনা ধারণ করতে হবে। 


আর যদি সেই মুখ্যচেতনা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হন। আলোচ্য প্রশ্নের উত্তরে উল্টো পথে হাটেন। ইসলামের স্রোত এক দিকে, আপনি ব্যাখ্যা করেন বিপরীত বা ভিন্ন দিকের। গতি পশ্চিম দিকে অথচ বললেন পূর্ব দিকে বা উত্তরপশ্চিম দিকে অথবা দক্ষিণ পশ্চিমদিকে তাহলে আপনি ইসলামের অপব্যাখ্যা করলেন। সঠিক ইসলামকে তুলে ধরতে ব্যার্থ হলেন। 
তাহলে আমরা বুঝতে পারলাম যে, ইসলাম অজস্র অংশ ও খন্ডের সমন্বয়ে গঠিত হলেও তার মুখ্যচেতনা রয়েছে যা সকল অংশ ও খন্ডকে যুক্ত করে রেখেছে। যা একে অপরের সাথে গাঁথা ও যুথবদ্ধ। সকলই একটি কেন্দ্রমুখী। কেন্দ্রকে উপলব্ধি করতে সক্ষম হলে শাখাপ্রশাখাও অনুধাবন করা যাবে এমন। কেন্দ্রের রোখ ও ঝোঁক যেদিকে সকলের রোখ ও ঝোঁকও সেদিকে। কেন্দ্র রক্ষা মানে সকলের রক্ষা। কেন্দ্র সরিয়ে দেওয়া অর্থই হবে প্রতিটি অংশকে নাড়া দেওয়া; নিজ অবস্থান থেকে সরিয়ে দেওয়া। এই কেন্দ্রীয় চেতনা ও মুখ্যভাবনার ব্যাখ্যাকেই এখানে ইসলামের ব্যাখ্যা বোঝানো হয়েছে। 


تفسير الإسلام هو بيان لهوية الإسلام التي تعبر عن غاياته، ومقاصده، ومعانيه الكلية، وتكوّن نظرية متكاملة ورؤية شاملة حول مفهوم الدين وعلاقته بأحكامه من العبادات والمعاملات والأخلاقيات، والمعاشرات والسياسيات وما يضاهيها من الأحكام.

ইসলামের হুবিয়্যা ও হাকীকত হলো ইসলামের মুখ্যচেতনা ও ভাবনা। প্রবন্ধের শেষে যখন ইসলামের সঠিক ব্যাখ্যার রূপরেখা নিয়ে আলোচনা হবে সেখানে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করা হবে। ইনশা আল্লাহ।


ইসলাম কেন অপব্যাখ্যার শিকার হয়েছে?


ইসলামের মুখ্যচেতনাই হলো ইসলামকে ব্যাখ্যা করার মূলভিত্তি। যে ব্যাখ্যার মাঝে মুখচেতনার প্রতিফলন ঘটবে তা স্বীকৃত ও গৃহিত হবে। আর যেখানে তার প্রতিফলন ঘটবে না সেই ব্যাখ্যা পরিত্যাজ্য বিবেচিত হবে। কুরআনুল কারীমের যে কোনো শব্দ বা বাক্য এমনিভাবে হাদীসের শব্দ বা বাক্যের ব্যাখ্যা করতে হলে মুখচেতনার অনুকূল ব্যাখ্যা করতে হবে। মুখ্যচেতনার সীমার বাইরে বা তার বিপরীতে কোনো ব্যাখ্যা করা যাবে না। 


যেমন: ইসলামে মুখ্যচেতনা হলো প্রতিটি কাজে আল্লাহ তাআলার অনুসরণ। কুরআন-হাদীসের স্থানে স্থানে এই চেতনা দেওয়া হয়েছে। তাই কুরআন-হাদীসের ব্যাখ্যাও হবে আল্লাহ তাআলার অনুসরণমুখী। অতএব কেউ যদি কোনো আয়াত বা হাদীসের এমন ব্যাখ্যা করে যাতে মানববুদ্ধির অনুসরণ বা প্রকৃতির অনুসরণ ফুটে ওঠে তাহলে তা কীভাবে গ্রাহ্য হতে পারে? এমন ব্যাখ্যা গ্রহণ করলে প্রধান ও কেন্দ্রীয় ভাবনা থেকে ইসলাম সরে যাবে এবং বিকৃতির পথে চালিত হবে। বিধায় ইসলামের অপব্যাখ্যার মূল কারণ সেই মুখ্যচেতনা ও মূল ভাবনা থেকে সরে যাওয়া। এখান থেকেই অপব্যাখ্যা আরম্ভ হয়েছে। এবং বিভিন্নরূপে অপব্যাখ্যার শিকার হয়েছে। ইসলামকে উপস্থাপন করা হয়েছে তার আপন রূপ বিকৃত করে। মুখ্যচেতনা থেকে সরিয়ে। কখনো এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন এটি রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আনীত ইসলাম নয়। বরং অন্য কোনো দীন। এভাবে অপব্যাখ্যার শিকার হওয়ার কারণ কী? কেনো তারা মুখ্যচেতনা থেকে সরে গেছে? এর পিছনে অনেক কারণই রয়েছে। ভুল পথে চালিত হওয়ার কারণ তো অনেক; অসংখ্য। ইমাম শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলবী রহ. দীন বিকৃতির কারণ প্রসঙ্গে বলেন:
لم يمكن الاستقصاء في معرفة مداخل الخلل، فإنها غير محصورة ولا متعينة. (حجة الله البالغة ১/৩৯৯)
‘ ভুলপথে পরিচালিত হওয়ার কারণসমূহ সুনির্ধারিত করে বলা সম্ভব নয়। কারণ তা অসংখ্য ও নির্দিষ্ট।’
ইমাম শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলবী রহ. হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা কিতাবে দীন বিকৃত কেন হয়Ñ তার কারণ নিয়ে বেশ দীর্ঘ আলোচনা করেছেন (দ্র. ১/ ৩৯৯-৪০৫)। তিনি মোট সাতটি কারণ উল্লেখ করেছেন। যথা: 
التهاون، والتعمق، والتشدد، والاستحسان، واتباع الإجماع الخاطئ، والتقليد الأعمى، وخلط ملة بملة.
‘অবহেলা, গভীর দৃষ্টিপাত, কঠোরতা, ইসতিহসান, ভুল ঐকমত্যের অনুসরণ, অন্ধ অনুসরণ, এক ধর্মকে আরেক ধর্মের সাথে সংমিশ্রন।’
আল্লামা শায়খ আবু যাহরা রহ. মানুষ ভুল ব্যাখ্যার দিকে কেন ঝুঁকেÑ  এ প্রসঙ্গে স্বীয় কিতাব তারীখুল মাযাহিবিল ইসলামিয়ার ভূমিকায় আলোচনা করেছেন। যে কোনো হাকীকত ও বাস্তবতাকে ভুল ব্যাখ্যা করার মৌলিক কারণ হিসেবে নিম্নের বিষয়গুলো চিহ্নিত করেছেন। 


الاختلاف الفكري بين الناس، وغموض الموضوع في ذاته، واختلاف الرغبات والشهوات والأمزجة، واختلاف الاتجاه، وتقليد السابقين، واختلاف المدارك، والرياسة وحب السلطان. 

‘মানুষের চিন্তাগত মতপার্থক্য, বিষয়ের দুর্বোধ্যতা, ঝোঁক-প্রবণতা, প্রবৃত্তি ও মেজাযের ভিন্নতা, দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা, পূর্ববর্তীদের অনুসরণ, উপলব্ধিশক্তির তারতম্য, নেতৃত্ব ও রাজত্বের লোভ।’
এই ইখতিলাফের কারণ বিশেষকরে ফিকহী ইখতিলাফের কারণ বিষয়ে বিশদ আলোচনা হয়েছে। অসংখ্য কিতাব রচিত হয়েছে। তবে দীন বিকৃতি এবং দীনের অপব্যাখ্যার মৌলিক কারন কী কী এ বিষয়টির আলোচনা তলনামূলক কম হয়েছে। বিষয়টি আরও দীর্ঘ আলোচনার দাবি রাখে। এখানে বিস্তারিত ব্যাখ্যা তুলে ধরা সম্ভব নয়; তাই গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কারণ এখানে সংক্ষেপে তুলে ধরছি।


১. অযোগ্যতা
প্রতিটি কাজ যথাযথ সম্পাদনের জন্য কাঙ্খিত যোগ্যতা অপরিহার্য শর্ত। কাঙ্খিত যোগ্যতা ব্যতীত গাড়ি চালালে যেভাবে মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয় তেমনি অযোগ্যতা নিয়ে দীনের ব্যাখ্যা করতে গেলে যা হবে তা হলো, দীনের বিকৃতি সাধন, নতুন ভুল ও ভ্রান্তির উৎপাদন। জ্ঞান-বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখায় কথা বলার ক্ষেত্রে অযোগ্যরা নিবৃত্ত থাকলেও ইসলামী বিষয়ে কারও নিয়ন্ত্রণ থাকে না। সবাই কথা বলে এবং নিজের মত করেই বলে। অনেক বুদ্ধিজীবীদের ইসলামী বিষয়ে কথা বলার ঢং থেকে প্রতিয়মান হয় যে ‘এক বিষয়ে প্রাজ্ঞ হলেই সকল বিষয়ে কথা বলার অধিকার অর্জিত হয় না’ একথা ভুলেই যান। ইসলামী বিষয়ে অযোগ্য হয়েও যোগ্যদের সুরে কথা বলেন এবং নতুন নতুন কুÑব্যাখ্যা আর অপব্যাখ্যা দিতেই থাকেন। মূলত যারা ইসলামের অপব্যাখ্যা করেছেন এবং করে যাচ্ছেন তাদের অপব্যাখ্যা করার মৌলিক একটি কারণ হলো, অযোগ্যতা।


২. অজ্ঞতা বা অপূর্ণ জ্ঞানকে পূর্ণ ভাবা
ইসলামের সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ বুঝ অর্জন না করেই অনেকে ইসলামের ব্যাখ্যা করে যাচ্ছেন। এতে তারা কখনও মারাত্মক ভুলের শিকার হচ্ছেন। অন্ধের হাতি দেখার মত হাতির কানকে কুলা আর দাতকে মুলা ভাবছেন এবং সেভাবেই অন্যদের সামনে ব্যাখ্যা করছেন।  আমাদের অনেক জেনারেল শিক্ষিত ভাই আছেন যারা নিজে নিজে ইসলামকে স্টাডি করেন। দক্ষ ও প্রাজ্ঞ কোনো আলেমের শরণাপন্ন হন না। নিজেই সবকিছু বোঝার চেষ্টা করছেন। তাদের মাঝে এই কারণটা বেশি দেখা যায়। হয়ত তিনি ইসলামের একটি দিক দেখেছেন অপরদিকটি দেখারই সুযোগ পাননি; জানাও নেই। আংশিক দেখেই তিনি পরিতৃপ্ত হয়ে গেছেন। এর উপর নিজের বুঝের ভিত্তি রেখেছেন। অথচ তিনি মুল বিষয়টিই পূর্ণরূপে বোঝেননি। 
এরপর সেই অপূর্ণ বুঝের আলোকে ইসলামের ব্যাখ্যা প্রদান শুরু করেছেন। কে সঠিক কে সঠিক নয়Ñ তা নির্ণয় করে যাচ্ছেন। তাদের অজ্ঞতা এবং জ্ঞানের অপূর্ণতা থেকে নির্গত হচ্ছো অজস্র অপব্যাখ্যা।


৩. অবহেলা বা উদাসীনতা
উদাসীনতা ও অবহেলাও অপব্যাখ্যা ও দীন বিকৃতির কারণ। এ কারণ দুই পক্ষ থেকেই হতে পারে। যারা দীনে ইলমের ধারক ও বাহক তারাও যদি অবহেলা করে এবং উদাসীনতা প্রদশর্ন করেন তাহলে তাদের প্রদত্ত ব্যাখ্যাও অপব্যাখ্যায় রূপ নিতে পারে। অন্যদিকে যারা ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ বা উদাসীন অথচ ইসলাম নিয়ে কথা বলতে আগ্রহী তাদের উদাসীনতা তাদেরকে ইসলামের মূল চেতনা থেকে দুরে সরিয়ে দিবে। আর তারা ব্যাখ্যার নামে অপব্যাখ্যা করতে থাকবে।
অনেক ভন্ড পীর যারা শরীয়াহর ব্যাপারে পুরাই উদাসীন। অথচ সে শরীয়াহর ব্যাখ্যা দিয়ে যাচ্ছে। ইসলামের ব্যাখ্যা দিয়ে যাচ্ছে। তাদের মাধ্যমে ইসলাম অপব্যাখ্যার শিকার হচ্ছে।
উদাসীনতার অনেকগুলো দিক রয়েছে। তন্মধ্যে একটি দিক হলো, সঠিক দীন ও দীনের সঠিক ব্যাখ্যার প্রচার না করা। ভুল ব্যাখ্যার প্রতিবাদ না করা। এতে সঠিক ব্যাখ্যা জানার সুযোগ কমে যাায় এবং অপব্যাখ্যার দার উন্মোচিত হয়। 


৪. বাড়াবাড়ি ও কঠোরতা
অযথা বাড়াবাড়ি ও কঠোরতাও মানুষকে ইসলামের মূল চেতনা থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে। অন্যান্য ধর্মের বিকৃতির পেছনে বড় একটি কারণ ছিলো গুলু অর্থাৎ অতি বাড়াবাড়ির পথ অবলম্বন। যার ফলে কুরআনুলকারীম এবং হাদীস শরীফে বারংবার গুলু থেকে বিরত থাকার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। আহলে কিতাবরা গুলু করে দীন বিকৃত করায় তাদেরকে সম্বোধন করে কুরআনুল কারীমে ইরশাদ হয়েছে:
يَاأَهْلَ الْكِتَابِ لَا تَغْلُوا فِي دِينِكُمْ
‘হে কিতাবীগণ! তোমরা নিজেদের দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না।’ (সূরা নিসা: ১৭১) 
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে,


قُلْ يَاأَهْلَ الْكِتَابِ لَا تَغْلُوا فِي دِينِكُمْ غَيْرَ الْحَقِّ وَلَا تَتَّبِعُوا أَهْوَاءَ قَوْمٍ قَدْ ضَلُّوا مِنْ قَبْلُ وَأَضَلُّوا كَثِيرًا وَضَلُّوا عَنْ سَوَاءِ السَّبِيلِ

‘ হে কিতাবীগণ! নিজেদের দীন নিয়ে অন্যায় ভাবে বাড়াবাড়ি করো না এবং এমন সব লোকের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করো না পূর্বে যারা নিজেরাও পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং অপর বহু লোককে পথভ্রষ্ট করেছে এবং তারা সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে।’ (সূরা মায়িদা: ৭৭)
হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গুলুর ব্যাপারে সাবধান করে বলেছেন:


 يا أيها الناس إياكم والغلو في الدين فإنه أهلك من كان قبلكم الغلو في الدين.

হে লোক সকল! তোমরা দীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করা থেকে বিরত থাকো। কেননা দীনের ব্যাপারে এই বাড়াবাড়ি তোমাদের পূর্ববর্তীদের ধ্বংস করেছে। (সুনানে ইবনে মাজাহ-৩০২৯) 
ইসলাম তো মুতাদিল ও মধ্যমপন্থী দীন। তাই বাড়াবাড়ি ও কঠোরতার সুরে ইসলামকে উপস্থাপন করলে স্বভাবত ইসলামের সঠিক ও প্রকৃত ব্যাখ্যা উঠে আসবে না। বর্তমানে অনেক ধর্মমনা ভাই আছেন যারা ফিতনার যুগে দীনকে আক্ষরিক অর্থেই পালন করতে চান। এবং অযথা বাড়াবাড়ি করে থাকেন। এ ধরনের বাড়াবাড়ি থেকে অপব্যাখ্যার সূত্রপাত হতে থাকে।


৫. বহিরাগত চিন্তা ও পূর্ব সিদ্ধান্তের অনুসরণ
অনেকেই আছেন যিনি ইসলামের বাইরের জগত পর্যবেক্ষণ করে বর্তমান সমাজ ও রাষ্ট্রের অবস্থা এবং মুসলিমদের দুর্দশা ইত্যাদি দেখে একটি চিন্তা পোষণ করেন। এবং তা লালন করতে থাকেন। এভাবে চিন্তাটি তার মাঝে পরিপুষ্ট হতে থাকে। এরপর নিজে নিজেই সেই চিন্তার আলোকে কুরআন ও হাদীস প—েন। বরং সেই বহিরাগত চিন্তাকে প্রামাণ্য করার জন্য পড়েেত থাকেন। এরপর নতুন নতুন ব্যাখ্যা হাজির করতে থাকেন। এ চিন্তাই তাকে অপব্যাখ্যার দিকে ঠেলে দেয়।


৬. রাজনৈতিক ও জাগতিক স্বার্থ
রাজনৈতিক এবং জাগতিক স্বার্থে ইসলামের অপব্যাখ্যা করার প্রবণতাও কম নয়। বরং কোনো কোনো দিক থেকে এ কারণটি অধিকমাত্রায় পাওয়া যায়। সেই খারেজী শীআ থেকে বর্তমান বুদ্ধিজীবী ও অনেক ইসলামিষ্টরা রাজনৈতিক স্বার্থে ইসলামের নতুন নতুন ব্যাখ্যা দিয়ে যাচ্ছে। নিজেদের ক্ষমতা পোক্ত করার উদ্দেশ্যে ইসলামের নতুন নতুন ব্যাখ্যা করছে। এমনকি স্বীকৃত বিষয়গুলোর অর্থ বিকৃতি করতে কুণ্ঠাবোধ করছে না। 


৭. ইসলাম বিদ্বেষ
ইসলামের প্রতি বিদ্বেষ থাকায় অনেকেই ইচ্ছা করে ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা দাঁড় করায়। বরং সে সুযোগ খোঁজে কোন দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলাম বিকৃতি করা যাবে। কোনো শব্দের কী ব্য্যখ্যা করলে ইসলাম কলুষিত হবে। মানুষকে ইসলামের মুখ্যচেতনা ভুলিয়ে দেওয়ার জন্য তারা নানাভাবে কাজ করে। যেমন: বর্তমান খ্রিস্টান মিশনারী ও প্রাচ্যবিদরা কাজ করে যাচ্ছে। 


৮. মুক্তচিন্তার চর্চা ও কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ
মুক্তচিন্তা; ব্যক্তিস্বাধীনতা; বাকস্বাধীনতা এগুলোর বর্তমান বড় একটি প্রয়োগ ক্ষেত্র হলো ধর্ম। অন্য ক্ষেত্রে যাই হোক ধর্মের ক্ষেত্রে মুক্তচিন্তা খুঁজে বেড়ায় কিছু মানুষ। কারও কারও কাছে তো মুক্তচিন্তা চর্চার অর্থ যৌক্তিকচিন্তার চর্চা নয় বরং ধর্মের উপর আপত্তি তোলা; প্রশ্ন করা; অযথা সংশয় প্রকাশ ইত্যাদি। এই মুক্তচিন্তাই তাদেরকে ঠেলে দিচ্ছে ইসলাম বিকৃত করার পথে। মুলত মুক্তচিন্তা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অপর নাম ইত্তিবাউল হাওয়া তথা প্রবৃত্তির অনুসরণ; প্রবৃত্তিকে ইলাহ বানানো। যে ব্যক্তি নিজের প্রবৃত্তিকে ইলাহ বানাবে সে কখনোই দীনকে বোঝার চেষ্টা করবে না বরং বিরোধিতা করবে। তাই কুরআনুল কারীমে প্রবৃত্তিকে ইলাহ বানাতে নিষেধ করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে:


وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنِ اتَّبَعَ هَوَاهُ بِغَيْرِ هُدًى مِنَ اللَّهِ

‘যে ব্যক্তি আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত হেদায়েত ছাড়া কেবল নিজ খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করে তার চেয়ে বেশি পথভ্রষ্ট আর কে হতে পারে।’ (সূরা কাসাস: ৫০)
আরও ইরশাদ হয়েছে:


أَفَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ وَأَضَلَّهُ اللَّهُ عَلَى عِلْمٍ

‘তুমি কি দেখেছো তাকে, যে তার খেয়াল-খুশীকে নিজ মাবুদ বানিয়ে নিয়েছে এবং জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও আল্লাহ তাকে গোমরাহীতে নিক্ষেপ করেছেন। (সূরা জাসিয়া: ২৩) 


৯. ভিন্ন সংস্কৃতির সংশ্রব ও অনুকরণ
ভিন্ন সংস্কৃতির খুব কাছে যাওয়া এবং অনুসরণ মানুষকে নিজের দীন ও সংস্কৃতির অপব্যাখ্যার দিকে নিয়ে যায়। অন্যদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলতে নিজের স্বকীয়তাকে হারায়। বর্তমানে অনেক নামধারী মুসলমানকে দেখা যাচ্ছে যারা হিন্দুবান্ধব ইসলামের ব্যাখ্যা দাঁড় করাচ্ছে। তারা হিন্দুদের সংশ্রবে গিয়ে নিজেকেই বিলিয়ে দিয়েছে। বিকিয়ে দিয়েছে নিজের চিন্তা-চেতনা ও দীন-ধর্মকে।
সংস্কৃতির আগ্রাসন সম্পর্কে যাদের ধারণা আছে তারা ভালো করেই জানেন যে, বর্তমান বিশ্বে অনেক জাতি নিজেদের মুখ্যচেতনা ও স্বকীয়তা হারিয়েছে ভিন্ন সংস্কৃতির প্রভাবে।


১০. অতি আধুনিকায়ন প্রবণতা
ইসলামের অপব্যাখ্যার গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণ ইসলামকে আধুনিকায়ন করা। আধুনিকায়নের প্রবণতা থেকেই ইসলামের নতুন নতুন ভার্সন তৈরি করা হচ্ছে। কোনো কোনো দেশে সরকারের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানেই এ কাজ সম্পাদিত হচ্ছে।
এখানে খুবই সংক্ষিপ্তভাবে বরং ইঙ্গিতসূচক মোটাদাগের কারণসমূহ তুলে ধরা হলো। অপব্যাখ্যার রূপরেখা অধ্যায়ে সামনে এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। ইনশা আল্লাহ।

অপব্যাখ্যার কবলে প্রাক্তন দীন
আল্লাহ তাআলা মানুষের হিদায়াতের জন্য যুগে যুগে নবী ও রাসূল প্রেরণ করেছেন। তারা সকলেই সঠিক দীনের প্রচার করেছেন। তওহীদের দাওয়াত দিয়েছেন। তাদের চলে যাওয়ার পর থেকেই আরম্ভ হয়েছে তাদের প্রচারিত দাওয়াতের অপব্যাখ্যা ও বিকৃতি। 
অপব্যাখ্যার ক্ষেত্রে ইহুদী ও বনী ইসরাইলদের বেশ খ্যাতি আছে। তারা আল্লাহর দেওয়া কিতাবের অপব্যাখ্যা করেছে। শব্দে, অর্থে, বাক্যে বিশ্বাসে প্রায় সর্ববিষয়েই তারা অপব্যাখ্যা করেছে। তাদের অপব্যাখ্যা ও বিকৃতির কথা কুরআানেও উল্লেখ হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে:


مِنَ الَّذِينَ هَادُوا يُحَرِّفُونَ الْكَلِمَ عَنْ مَوَاضِعِهِ

‘কোনো কোনো ইয়াহুদী কথার লক্ষ্য থেকে তার মোড় ঘুরিয়ে নেয়।’ (সূরা নিসা: ৪৬)


وَإِنَّ مِنْهُمْ لَفَرِيقًا يَلْوُونَ أَلْسِنَتَهُمْ بِالْكِتَابِ لِتَحْسَبُوهُ مِنَ الْكِتَابِ وَمَا هُوَ مِنَ الْكِتَابِ وَيَقُولُونَ هُوَ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ وَمَا هُوَ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ وَيَقُولُونَ عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ وَهُمْ يَعْلَمُونَ

‘আর তাদের মধ্যে একদল রয়েছে যারা বিকৃত উচ্চারণে মুখ বাঁকিয়ে কিতাব পাঠ করে যাতে তোমরা মনে কর যে, তারা কিতাব থেকেই পাঠ করছে। অথচ তারা যা আবৃত্তি করছে তা আদৌ কিতাব নয়। এবং তারা বলে যে, এসব কথা আল্লাহর তরফ থেকে আগত অথচ এসব আল্লাহর তরফ থেকে প্রেরিত নয়। আর তারা জেনেশুনে আল্লাহর প্রতি মিথ্যারোপ করে। (সূরা আলে ইমরান: ৭৮)
হযরত ঈসা আ. প্রেরিত হয়েছিলেন বনী ইসরাইলের প্রতি। তিনি তাওহীদের দাওয়াত দিয়েছেন। মানুষকে এক আল্লাহর সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। বাইবেলের পুরাতন নিয়ম (Old Testament) এবং নতুন নিয়ম (New Testament) এক আল্লাহর কথাই আছে। যেমন:.


ক. ‘তোমরা যাতে জানতে পার যে, আল্লাহই মাবুদ এবং তিনি ছাড়া আর কোন মাবুদ নেই।’  (বাইবেল; কিতাবুল মুকাদ্দাস পৃ. ২৩০)


খ. ‘বনি-ইসরাইলবা শোন, আমাদের মাবুদ আল্লাহ এক।’  (বাইবেল; কিতাবুল মুকাদ্দাস; পৃ. ২৩২)


গ. ‘তুমি মহান আর অলৌকিক চিহ্ন দেখিয়ে থাক; একমাত্র তুমিই আল্লাহ।’ (বাইবেল; কিতাবুল মুকাদ্দাস; পৃ. ৭৫৩)


ঘ. ‘তুমি তোমার মাবুদ আল্লাহকেই ভয় করবে, কেবল তারই এবাদত করবে।’ (মথি; ৪/ ১০)


এমনিভাবে বাইবেলে অসংখ্য স্থানে ইবন বা পুত্র শব্দটি রূপক অর্থে ব্যবহার হয়েছে। আল্লাহর প্রিয় বান্দাদেরকে ইবনুল্লাহ আখ্যা দেওয়া হয়েছে। রূপকার্থে। যেমন:
ক. ‘ তোমরা তোমাদের মাবুদ আল্লাহর সন্তান।’ (বাইবেল পৃ. ২৪৩)


খ. ‘তোমার সেই সন্তানই আমার সুনামের জন্য একটা ঘর তৈরি করবে। তার রাজ-সিংহাসন আমি চিরকাল স্থায়ী করব। আমি হব তার পিতা আর সে হবে আমার পুত্র।’ (বাইবেল পৃ. ৩৯৮)


গ. ‘ আমি ইসরাইলের, অর্থাৎ আফরাহীমের পিতা আর সে আমার প্রথম সন্তান।’ (বাইবেল পৃ. ৯৭২)


ঘ. ‘ মোবারক তারা, যারা লোকদের জীবনে শান্তি আনবার জন্য পরিশ্রম করে, কারণ আল্লাহ তাদের নিজের সন্তান বলে ডাকবেন’ (মথি; পৃ. ৫/৯)


খোদ কুরআনেও ইহুদীর দাবি উল্লেখ হয়েছে যে, তারা নিজেদেরকে ইবনুল্লাহ আখ্যা দিয়েছে। কুরআনুল কারীমে উল্লেখ হয়েছে,


وَقَالَتِ الْيَهُودُ وَالنَّصَارَى نَحْنُ أَبْنَاءُ اللَّهِ وَأَحِبَّاؤُهُ

‘ইয়াহুদী এবং খ্রিস্টানরা বলে, আমরা আল্লাহর সন্তান ও তার প্রিয়ভাজন।' (সূরা মায়েদা: ১৮)


হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম আসমানে চলে গেলেন আর দুষ্কৃতিকারীদের অপব্যাখ্যার সুযোগ হয়ে গেলো। সেন্ট পৌল তার অনুসারীদের নিয়ে ঈসা আলাইহিস সালামের নামে নতুন বিশ্বাস আবিষ্কার করলো। আশ্রয় নিলো বাইবেলের অপব্যাখ্যার। তারা তওহীদকে ত্রিত্ববাদে রূপান্তরিত করলো। ঈসা আ. কে আল্লাহর প্রকৃত পুত্র সাব্যস্ত করলো। নতুন নতুন বিধান আবিষ্কার করলো। এক পর্যায়ে হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের আনীত দীন ও দাওয়াত পৌলবাদে রুপান্তরিত হলো।


এই অপব্যাখ্যাই হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের আনীত দীন ও দাওয়াহকে ধ্বংস করে ছেড়েছে। একই কর্মকান্ড আরম্ভ হয়েছিলো ইসলামের খিলাফাতযুগে। ইবনে সাবা নামক ইহুদী পায়তারা করেছিলো হযরত আলীর নামে ইসলামের অপব্যাখ্যা চালিয়ে দেওয়ার। ‘হযরত আলী রা. এর মৃত্যু হয়নি; তিনি আকাশে আছেন; আবার দুনিয়াতে আসবেন। বিরোধীদের প্রতিশোধ নিবেন। তিনি এখনো বার্তা প্রেরণ করছেন’Ñ ইত্যাদি মনগড়া দাবি করে কিছু মানুষকে প্রভাবিত করেছিলো। কিছু লোক তার পেছনে ছুটেছে। ইসলামের নতুন ভার্সন তৈরির চেষ্টা করে। বর্তমানে শীআ নামে পরিচিত মতবাদই হলো তারা। কিন্তু আলিম সাহাবী ও তাবেঈগণ তাদের অপব্যাখ্যাকে রুখে দিয়েছেন। ইসলামকে বিকৃতির হাত থেকে বাঁচিয়েছেন। ইবনে সাবা ও তার অনুসারীদের মুখোশ উন্মোচন করেছেন। তাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা না থাকলে আজ ইসলামের পরিণতি প্রচলিত খ্রিস্টবাদের মত হত।


অপব্যাখ্যা ইসলামের মাঝে ফিরকা সৃষ্টি করেছে
ইসলামের নামে অনেক ফেরকা সৃষ্টি হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভবিষ্যদ্বাণীও করে গেছেন যে, এই উম্মত বিভিন্ন দলে উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়বে। বণিত হয়েছে:


إنَّ بني اسرائيلَ افترقتْ على إحدى وسبعين فرقةً ، وإنَّ أمتي ستفترقُ علي اثنتيْنِ وسبعين فرقةً ، كلُّها في النارِ إلا واحدةً

‘বনী ইসরাঈল একাত্তর দলে বিভক্ত হয়েছে। আর আমার উম্মত বাহাত্তর দলে বিভক্ত হবে। একদল ব্যতীত সবাই জাহান্নামে যাবে।' (সুনানে ইবনে মাজাহ-৩৯৯৩, মুসনাদে আহমাদ-৩/ ১৪৫)
এ সকল দলের উদ্ভাবনের মূল কারণ অপব্যাখ্যা। তারা সবাই কুরআনকে মান্য করে। কুরআনকে বিশ্বাস করে। তারা এটাও জানে যে, ইসলামের ভিতরে বহিরাগত চিন্তা প্রবেশ করাতে হলে কুরআন হাদীসের নামেই করতে হবে। তাই তারা কুরআনের আয়াতের অপব্যাখ্যার আশ্রয় নেয়। আয়াত তো পড়ে কুরআন থেকে কিন্তু অর্থ ও ব্যাখ্যা করে নিজ মতাদর্শের আলোকে। 
ইসলামের শুরু যুগের একটি বাতিল ফেরকা হলো, খারেজী ফেরকা। তারা এই অপব্যাখ্যার পথই বেছে নিয়েছিলো। তারা কুরআন থেকেই নিজেদের স্বপক্ষে উদ্ধৃতি পেশ করতো। কিন্তু সঠিক ব্যাখ্যা না করে নিজেদের স্বার্থমাফিক ব্যাখ্যা দাঁড় করাতো। তাদেরকে সম্বোধন করেই হযরত আলী রা. বলেছিলেন:


كلمة حق أريد بها الباطل

‘কথা সত্য কিন্তু উদ্দেশ্য অসৎ।’
এটাই সেই দীন বিকৃতির সদর দরজা যা দিয়ে খারেজী ও অন্যান্য ফেরকার লোকেরা প্রবেশ করেছে। আল্লামা আবুল ফাযায়েল আহমদ বিন মুহাম¥াদ মুখতার রহ. (৬৩৭হি. পর) একটি কিতাব রচনা করেছেন হুজাজুল কুরআন (حجج القرآن) নামে। এই কিতাবে তিনি দিখিয়েছেন যে, প্রত্যেক ফেরকাই কুরআন থেকে দলীল দেয়। তারা কীভাবে কুরআন থেকে আয়াত নির্বাচন করে এবং নিজ থেকে ব্যাখ্যা দান করে তা তিনি দেখিয়েছেন। তিনি ভূমিকায় মূল আটটি ফেরকা ও তার শাখা ৭৩টি ফেরকার কথা উল্লেখ করে বলেন:


ما من فرقة إلا ولها حجة من الكتاب، وما من طائفة إلا وفيها علماء تحارير فضلاء، لهم في عقائدهم مصنفات وفي قواعدهم مؤلفات، وكل منهم يؤول دليل صاحبه على حسب عقيدته ووفق مذهبه. (حجج القرآن ص/ ৪)

‘প্রতিটি দলেরই কুরআনে দলীল আছে। প্রতিটি দলেই দক্ষ আলেম রয়েছেন। আকীদা বিষয়ে তাদের গ্রন্থাদি রয়েছে। উসূল বিষয়ে গ্রন্থাদি রয়েছে। ফলে প্রত্যেকেই নিজ নিজ আকীদা ও মাযহাব অনুসারে অন্যের দলীলের ব্যাখ্যা প্রদান করে থাকে।’


কুরআনের কিছু শব্দ ও বাক্যে ব্যাপকতা থাকায় তারা কুরআনকেই হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। অনেকে তো কুরআন থেকে অনায়াসে নিজের মত প্রমাণ করার লক্ষ্যে হাদীসকে অস্বীকার করে বসেছে। যখন তারা দেখেছে যে, কুরআন থেকে নিজেদের মনগড়া মতবাদ প্রমাণের ক্ষেত্রে হাদীস প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে। কুরআনে বর্ণিত মুতলাক বিধানকে হাদীসের মাঝে মুকাইয়াদ করা হয়েছে। তখন তারা হাদীসকেই ইনকার করে বসেছে। 


এ কারণে সাহাবায়ে কেরাম রা. কোনো কোনো ক্ষেত্রে কুরআনের চেয়ে হাদীস দ্বারা প্রমাণ পেশ করাকেই প্রাধান্য দিতেন। হযরত উমার রা. বলেন:


إنه سيأتي ناس يجادلونكم بشبهات القرآن، فخذوهم بالسنن، فإن أصحاب السنن أعلم بكتاب الله عز وجل

‘একসময় কিছু লোকের আবির্ভাব ঘটবে যারা কুরআনের মুতাশাবিহাত আয়াত নিয়ে তোমাদের সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত হবে। তখন তোমরা সুন্নাহ দিয়ে তাদের ধরাশায়ী করো। কারণ, সুন্নাহওয়ালারাই আল্লাহর কুরআন সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত।’ (সুনানে দারিমী হাদীস নং-১২১)
হযরত আলী রা. যখন ইবনে আব্বাস রা. কে খারেজীদের সাথে কথা বলার জন্য এবং তাদের সংশয় দূরীভিত করার লক্ষ্যে প্রেরণ করেছিলেন তখন তিনি কুরআনের পরিবর্তে হাদীস থেকেই প্রমাণ পেশ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন: 


 اذهب إليهم فخاصمهم وادعهم إلى الكتاب والسنة ولا تحاجهم بالقرآن فإنه ذو وجوه ولكن خاصمهم بالسنة] (الجزء المتمم لطبقات ابن سعد ১/১৮১)

‘আপনি তাদের কাছে গিয়ে যুক্তিতর্ক করুন। কুরআন-সুন্নাহর প্রতি তাদের আহ্বান করুন। তবে শুধু কুরআন দিয়ে তর্ক করবেন না। কারণ, কুরআনে বিভিন্ন ব্যাখ্যার সুযোগ আছে। তাদের সাথে সুন্নাহর আলোকে তর্ক করুন।’
ইসলামের নামে যতগুলো ফেরকা আবির্ভাব হয়েছে তাদের দাবী ও দলীলের প্রতি লক্ষ করলেই প্রতীয়মান হবে যে তারা নানা কৌশলে অপব্যাখ্যার আশ্রয় নিয়েছে। কখনো নির্দিষ্ট বিধানে বা নির্দিষ্ট নসে আবার কখনো মোলিক  আকীদায়। কখনোবা ইসলামের মুখ্যচেতনা বর্জন করে নতুন ভার্সনই সৃষ্টি করে ফেলেছে।


শত অপব্যাখ্যার মাঝেও সত্য সংরক্ষিত
আল্লাহ তাআলা এই দীনকে সুরক্ষিত রেখেছেন এবং রেখে যাচ্ছেন। আল্লাহ তাআলা নিজেই ঘোষণা দিয়েছেন:


إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ.

‘আমি কুরআন নাযিল করেছি এবং আমিই এর হেফাযতকারী।’ (সূরা হিজর: ৯)


সুতরাং আল্লাহ তাআলা কুরআনকে হেফাযত করবেন। কুরআনের অর্থকেও হেফাযত করবেন। তাই কুরআনের অপব্যাখ্যাকে প্রতিষ্ঠিত হতে দেননি। সামনেও দিবেন না। 
আল্লাহ তাআলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে দীনকে পূর্ণতা দান করেছেন। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা উম্মাহকে বুঝিয়ে দিয়েছেন এবং দীন ও উম্মাহকে পরিষ্কার ও স্বচ্ছ তরীকায় রেখে গেছেন।  কোথাও দ্বিমত দেখা দিলে কী করণীয়- তাও বাতলে দিয়েছেন। বর্ণিত হয়েছে:


تركتكم على البيضاء ليلها كنهارها لا يزيغ عنها بعدي إلا هالك ، ومن يعش منكم فسيرى اختلافا كثيرا فعليكم بما عرفتم من سنتي وسنة الخلفاء المهديين الراشدين .( أخرجه أبو داود (৪৬০৭)، والترمذي (২৬৭৬)، وابن ماجه (৪২)، وأحمد (১৭১৪৪) باختلاف يسير)

‘আমি তোমাদেরকে এমন স্পষ্ট দিনের উপর রেখে যাচ্ছি যার রাত ও দিন সমান। এই দিন থেকে যে ব্যক্তি ছিটকে পড়বে সে ধ্বংস হবে। তোমাদের মধ্য থেকে যারা বেঁচে থাকবে তারা অবশ্যই অনেক মতভেদ দেখতে পাবে। তখন তোমরা আমার সুন্নত এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নতের নামে প্রচারিত বিষয়গুলোর মধ্য থেকে যেগুলোকে চিনতে পারো সেগুলোকে আঁকড়ে ধরো।’
এরপর আল্লাহ তাআলা যুগে যুগে এমন উলামা সৃষ্টি করেছেন যারা দীনকে সমুন্নত ও অক্ষত রাখায় নিয়োজিত ছিলেন এবং আছেন। একাধিক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে:


لا تزال طائفة من أمتي يقاتلون على الحق ظاهرين إلى يوم القيامة.....

‘কিয়ামত পর্যন্ত আমার উম্মতের একদল সর্বদা হকের পক্ষে কিতাল করবে এবং বিজয়ী হবে।’ (সহীহ মুসলিম হাদীস নং- ১৯২৩)
এছাড়াও ঘোষণা হয়েছে যে, কখনোই গোটা উম্মাহ একযোগে ও একসাথে গোমরাহ হবে না। এমন সম্ভব নয় যে, গোটা উম্মাহ ইসলামের মূল বাণী ভুলে গেছে বা মূল চেতনাই হারিয়ে ফেলেছে। ইরশাদ হয়েছে:


إن الله لا يجمع أمتي، أو قال: أمة محمد صلى الله عليه وسلم، على ضلالة 

‘ আল্লাহ তাআলা আমার উম্মতকে গোমরাহীর ঐক্যবদ্ধ করবেন না।’ (সুনানে তিরমিযী হাদীস নং- ২১৬৭) 
উম্মাহর উলামায়ে কেরাম দীনকে সুরক্ষিত রাখা ও সর্বপ্রকার অপব্যাখ্যা থেকে নিরাপদ রাখার প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। তারা হক ও বাতিলের মানদণ্ড স্থির করে রেখেছেন। যেকোনো সময়ই এর মাধ্যমে পরিমাপ করা যাবে। নির্ণয় করা যাবে কোনটি হক আর কোনটি বাতিল। এই ধারা কিয়ামত পর্যন্ত চলমান থাকবে। সুতরাং দীনও কিয়ামত পর্যন্ত অক্ষত থাকবে।
অপব্যাখ্যা রোধে উলামায়ে কেরামের দায়িত্ব


প্রত্যেক যুগেই উলামায়ে কেরাম হককে সমুন্নত রেখেছেন। তাদের সর্বোচ্চ সামর্থ ও শক্তি দিয়ে দীনের সংরক্ষণ করেছেন। যখনই বাতিল মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে উলামায়ে কেরাম সরব হয়েছেন। বাতিলকে রুখে দিয়েছেন। বাতিলকে রোধ করা এবং হককে সমুন্নত রাখার ক্ষেত্রে রয়েছে উলামায়ে কেরাম এক সোনালী অধ্যায়। ইতিহাসের পাতা উল্টালেই আমরা দেখতে পাবো তাদের সেই অবদান ও কৃতিত্ব।


রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকেই এ দায়িত্ব তাঁরা প্রাপ্ত হয়েছেন। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে বিভিন্ন স্থানে বাতিলকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য প্রেরণ করেছেন। তারা বাতিলকে নিশ্চিহ্ন‎ করে সেখানে হকের প্রতিষ্ঠা করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরবর্তীদের জন্য ইরশাদ করেছেন:

يحمل هذا العلم من كل خلف عدوله، ينفون عنه تحريف الغالين، وانتحال المبطلين، وتأويل الجاهلين.

‘প্রত্যেক পরবর্তীদের থেকে একদল ন্যায়পরায়ন লোক এই ইলমের ধারক-বাহক হবে। তারা দীনের নামে সীমালঙ্গনকারীদের বিকৃতি, বাতিলপন্থীদের মিথ্যা দাবী এবং জাহিলদের অপব্যাখ্যা রোধ করবে। (শরহু মুশকিলিল আসার হাদীস নং- ৩৮৮৪)


রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রেখে যাওয়া এই মহাদায়িত্ব যুগে যুগে উলামায়ে কেরাম যথাযথ পালন করেছেন। তারা দীন সঠিকভাবে ধারণ করেছেন এবং উত্তমরূপে সংরক্ষণও করেছেন। পরবর্তীদের কাছে অক্ষতরূপে বিতরণ করেছেন। উলামায়ে কেরাম এ দায়িত্ব পালন করেই যাবে।


বর্তমানে সর্বত্র বাতিলের সয়লাব। বিশেষ করে ইসলামের অপব্যাখ্যা চলছে সর্বত্র। বিগত সময়েও যখন অপব্যাখ্যা মাথাচাড়া দিয়েছে উলামায়ে কেরাম সরব হয়েছেন। মানুষকে সচেতন করেছেন। সংশয় নিরসনে সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে কাজ করেছেন। আবারও জেগে উঠতে হবে সেই প্রহরীকে। সকল অপব্যাখ্যাকে রোধ করতে হবে। 


অপব্যাখ্যা রোধ করার পূর্বে আমাদের দুটি প্রস্তুতি নিতে হবে।

এক. আমাদের প্রথমে জানতে হবে, ইসলামের মূল চেতনা ও ভাবনা কী? ইসলামের দাবি কী? ইসলামের ব্যখ্যা করতে হয় কীভাবে? এর জন্য কী কী উসূল ও যাবেতা রয়েছে? এ ধরনের সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো যথাযথরুপে আয়ত্ত্ব করতে হবে। নিজের মাঝে অস্পষ্টতা থাকা যাবে না।


দুই. যুগে যুগে যারা অপব্যাখ্যা করেছে এবং এখনও করে যাচ্ছেÑ তাদেরকে জানতে হবে। তাদের মতাদর্শ ও চিন্তা-চেতনা বোঝার চেষ্টা করতে হবে। তারা কী বলতে চায়? কী তাদের উদ্দেশ্য? কোন শব্দের বা বাক্যের অপব্যাখ্যা করছে অথবা কোনো মৌলিক চেতনা লঙ্ঘন করছে তা পরিষ্কারভাবে জানতে হবে। মূল ও প্রাসঙ্গিক বিষয়কে না বুঝে নিছক কিছু অপ্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়ে হৈচৈ করা মোটেও ঠিক হবে না। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমরা প্রায়ই মূল  সমস্যা না বুঝে কোথায় অপব্যাখ্যা হয়েছে; কতটুকু হয়েছে; কী ধরনের হয়েছে; এ সব না বুঝেই হৈচৈ আরম্ভ করি। কাফির-মুরতাদ আখ্যা দিতে থাকি। আমাদেরকে আরও সর্তক হতে হবে।


অপব্যাখ্যার মৌলিক কিছু রূপ
ইসলাম অপব্যাখ্যার এ পরিমাণ পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়েছে যে, গণনা করাও কঠিন। প্রতিটি পদ্ধতির পরিচিতি তুলে ধরা আরও দুরূহ ব্যাপার। বক্ষমাণ প্রবন্ধে মৌলিক কয়েকটি অপব্যাখ্যার রূপ তুলে ধরার চেষ্টা করবো। ইনশাআল্লাহা। পদ্ধতিসমূহের সবগুলো এক স্তর ও পর্যায়ের নয়। এর মাঝেও স্তরবিন্যাস রয়েছে। নিম্নে একটি তালিকা উল্লেখ করছি। পরবর্তীতে বিস্তারিত আলোচনা হবে। যথা: 
التفسير الباطني للإسلام
التفسير الظاهري للإسلام
التفسير العقلاني للإسلام
التفسير النفعي للإسلام
التفسير المادي للإسلام
التفسير السياسي للإسلام
التفسير العسكري للإسلام
التفسير الاتجاهي للإسلام
التفسير الخطابي للإسلام
এখানে সামগ্রিক একটি তালিকা দেওয়া হলো। ইসলামকে এতগুলো দিক থেকে অপব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং হচ্ছে। বিস্তারিত আলোচনায় এগুলোর শাখা প্রশাখা নিয়ে আলোকপাত করা হবে। সর্বশেষে ইসলামের সঠিক ব্যাখ্যা (التفسير الصحيح للإسلام) কী?  এবং কীভাবে করতে হয়? কী কী উসূল ও যাবেতা অনুসরণ করতে হয়? তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। ইনশাআল্লাহ।

 

 

ডাউনলোড

কোনো ডাউনলোডযোগ্য ফাইল নেই

বইয়ের তথ্য