আফকারে কুরআন সিরিজ ০১
কুরআন এক অনন্ত জগত—যার গভীরতায় ডুব দিয়েও কেউ তার শেষ প্রান্তে পৌঁছাতে পারে না। তাকে নিয়ে যুগে যুগে লক্ষ-কোটি গবেষণা, রচনা ও চিন্তার স্রোত বইয়ে গেছে; অসংখ্য দিক উন্মোচিত হয়েছে, আবার অসংখ্য দিক আজও অমোঘ রহস্যের মতো অরাবৃত রয়ে গেছে।
হাজার বছরের ইতিহাসে অসংখ্য তাফসির রচিত হয়েছে। প্রতিটি তাফসির যেন এক একটি ফুল—নিজস্ব রং, নিজস্ব ঘ্রাণ, নিজস্ব সৌন্দর্য নিয়ে প্রস্ফুটিত। প্রত্যেক ব্যাখ্যাকার কুরআনের এক একটি দিক, এক একটি রূপ ও সৌন্দর্য উন্মোচনের প্রয়াস নিয়েছেন।
তবুও প্রশ্ন থেকে যায়—শেষ কি হয়েছে সেই উন্মোচন?
না, কুরআনের বিস্ময়ের শেষ নেই।
“لَا تَنْقَضِي عَجَائِبُهُ” — তার আশ্চর্য কখনো ফুরায় না।
তাফসীর রচনার সীমার বাইরে থেকেও অসংখ্য গবেষক ও আলেম কুরআনের গভীরে প্রবেশ করেছেন এবং সেখান থেকে মনিমুক্তা আহরণ করেছেন। প্রতিটি যুগে তাঁরা কুরআনের ভিন্ন ভিন্ন দিক নিয়ে অধ্যয়ন করেছেন—নিজেরা তৃপ্ত হয়েছেন, অন্যদেরও তৃপ্তি দিয়েছেন। আবার যখন নতুন কোনো প্রশ্ন বা বিষয় সামনে এসেছে, তাঁরা পুনরায় কুরআনের দিকে ফিরে গেছেন, সেখান থেকেই পরিতৃপ্তি ও সমাধান খুঁজেছেন।
এভাবেই এক একজন কুরআনপ্রেমী গবেষক কুরআনের হাজারো দিক থেকে আলো সংগ্রহ করেছেন। ইতিহাসে এমন বহু মনীষীর নাম লিপিবদ্ধ আছে, যারা কুরআনকে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে অনুধাবন করেছেন, তার অর্থ ও সৌন্দর্যের নানান কণায় ডুব দিয়েছেন।
আমাদের নিকট অতীতেই এমন অনেক আলেমের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়—যেমন আমাদের সর্বজন-শ্রদ্ধেয় মুরব্বি, হযরত থানভী রহ.-এর বিশিষ্ট খলিফা, হযরত মাওলানা আবদুল বারী নদভী রহ.। যখন তাঁর সামনে কোনো জটিলতা দেখা দিত—সেটি খাঁটি দীনী, ইলমী, কিংবা দুনিয়াবি সমস্যা হোক না কেন—তিনি কুরআনের দিকে ফিরে যেতেন। এবং সমাধান পেয়ে যেতেন। তিনি বলেন,
جب کوئی خالص علمی ودینی ہی نہیں عملی ودنیوی مشکل بھی پیش آتی تو ارنا الحق حقا کی دعا کے ساتھ راہ حق پہلے براہ راست کلام حق ہی میں تلاش کرتا ہوں اور الحمد للہ اکثر کامل شرح صدر کے ساتھ دیر سویر مل جاتی ہے۔ (تجدید معاشیات ص/۱)
এ স্রোত ও ধারা থেমে নেই, যুগ যত অগ্রসর হচ্ছে, ততই কুরআনকে নতুনভাবে অধ্যায়ন করা হচ্ছে; কুরআনের নতুন নতুন দিক উন্মোচিত হচ্ছে, নতুন চাহিদা ও প্রশ্ন সামনে আসছে—আর কুরআন তার প্রতিটি যুগের মানুষকে দিচ্ছে নতুন আলো, নতুন অনুপ্রেরণা, উপযোগী সমাধান।
আধুনিক যুগ জন্ম দিয়েছে নিত্যনতুন জটিলতার, সৃষ্টি করেছে বহুমাত্রিক স্রোত ও প্রবণতার। চিন্তা, দর্শন, সমাজ, রাজনীতি ও বিজ্ঞান—সব ক্ষেত্রেই ঘটেছে দ্রুত ও গভীর পরিবর্তন। এই পরিবর্তনের তরঙ্গে ভেসে এসেছে নতুন নতুন সমস্যা, প্রশ্ন ও সংকট—যার সংখ্যা অগণিত, আর ধরন বৈচিত্র্যময়।
আজকের মানুষ বিজ্ঞানমুখী। বিজ্ঞান তাকে শিখিয়েছে প্রশ্ন করতে—“কেন?”, “কিভাবে?”, “কিসের ভিত্তিতে?”
সে এখন কুসংস্কারমুক্ত বাস্তবতার সন্ধানী। বাহ্যিক ঘটনার আড়ালে কারণ ও কার্যকারণ বুঝতে চায়। কেবল ঘটনার বিবরণ নয়—তার অন্তর্নিহিত মর্ম, উদ্দেশ্য ও ফলাফল অনুধাবন করতে আগ্রহী। সে কল্যাণ ও অকল্যাণের মূলনীতি জানতে চায়।
তার চিন্তা এখন যুক্তিনির্ভর; সে প্রত্যেক বিষয়ের পেছনে যৌক্তিক ভিত্তি ও শক্তিশালী তত্ত্বের প্রত্যাশা করে।
কারণ, সে বিশ্বাস করে—এই বিশাল মহাবিশ্ব কোনো বিশৃঙ্খলতার ফল নয়, বরং এক সুনির্দিষ্ট সূত্র ও প্রজ্ঞাময় নকশায় গাঁথা সৃষ্টিজগত। তাই সে সেই সূত্রের অনুসন্ধান করে, তা বুঝতে ও উপলব্ধি করতে নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যায়।
এই অনুসন্ধানী মনোভাবই তৈরি করেছে এক নতুন চাহিদা। আধুনিক মানুষ এখন ধর্মের ভেতরে সেই চাহিদার পরিতৃপ্তি খোঁজে। সে চায়, কুরআন তার সামনে এমনভাবে উপস্থাপিত হোক—যেন কুরআন তারই ভাষায়, তারই চিন্তার ধারায়, তার সাথেই কথা বলছে।
সে চায়, কুরআন তার প্রশ্নের জবাব দিক যুক্তির দীপ্তিতে, সত্যের দৃঢ়তায়, বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে।
এটাই আজকের যুগের ডাক—কুরআনের সেই অসীম জগতকে নতুনভাবে অনুধাবন করা, আধুনিক অনুসন্ধানী মননের সঙ্গে তার সংযোগ সৃষ্টি করা। কারণ, কুরআন কোনো যুগের নয়, বরং সকল যুগের গ্রন্থ;
সমস্যার এখানেই শেষ নয়; জটিলতা আরও গভীরে—চিন্তার জগতে, বিশ্বাসের ভিতরে, জীবনের প্রতিটি স্তরে। কনেনা আধুনিক গবেষণা ও জ্ঞানের অগ্রযাত্রা জন্ম দিয়েছে অগণিত নতুন মতবাদ, দর্শন ও তত্ত্বের। সমাজ, রাষ্ট্র, অর্থনীতি ও আইন—সব ক্ষেত্রেই গড়ে উঠেছে নতুন নতুন ব্যবস্থাপনা কাঠামো। এমনকি নীতি ও নৈতিকতার পুরোনো সংজ্ঞাগুলোও পেয়ে গেছে নতুন রূপ, নতুন ব্যাখ্যা।
জীবনকে ব্যাখ্যা করার জন্য, জীবনযাত্রায় নতুন গতি আনার জন্য, এবং জগত, মানুষ ও সৃষ্টির রহস্য উন্মোচনের জন্য মানুষের মধ্যে জন্ম নিয়েছে নতুন নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। বিশেষত পাশ্চাত্য বিশ্ব এই বুদ্ধিবৃত্তিক স্রোতের নেতৃত্ব দিয়েছে—তারা গড়েছে এক নতুন সভ্যতা, যেখানে মানবতা, মুক্তচিন্তা, বাকস্বাধীনতা, নারীস্বাধীনতা, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, পুঁজিবাদ, সাম্যবাদ, ব্যক্তিবাদ—আরও অসংখ্য মতবাদ ও তত্ত্ব মিলেমিশে এক জটিল সাংস্কৃতিক ধারা সৃষ্টি করেছে।
এই সববাদ, মতবাদ ও তত্ত্বের মূল উদ্দেশ্য হলো—জীবনকে ব্যাখ্যা করা, জীবনকে নিয়ে নতুন দর্শন জন্মে দেয়া, নতুন মাত্রায় পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু যখন তারা ইসলামের সামনে এসে দাঁড়ায়, তখন তারা উপলব্ধি করে—তাদের এই সব জীবনব্যবস্থা ও দর্শনেরর সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক হলো ইসলাম। আর ইসলামের উৎস হিসেবে কুরআনুল কারীম।
ফলে এই সমস্ত আধুনিক মতবাদ ও দর্শন একযোগে আক্রমণ শুরু করেছে কুরআনের উপর, ইসলামের উপর। সৃষ্টি হয়েছে চিন্তার সংঘাত, সভ্যতার সংঘাত—এ যেন নতুন এক গাযওয়াতুল আহযাব!!
যেখানে সব শক্তি মিলে ইসলামের মূল উৎস—কুরআনের বিরুদ্ধেই ময়দানে নেমেছে। এই সর্বগ্রাসী বুদ্ধিবিকৃতি ও মানসিক আগ্রাসনের মোকাবিলায় কুরআন সদা প্রস্তুত। যে দিক থেকে আগ্রাসন এসেছে, কুরআনও সেই দিক থেকেই জবাব দিয়েছে। ভ্রান্ত চিন্তার বিপরীতে দিয়েছে সঠিক চিন্তার আলো; বিকৃত আদর্শের স্থলে উপহার দিয়েছে সত্য ও ভারসাম্যের আদর্শ; অসার নীতি-নৈতিকতার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠা করেছে এমন নৈতিক ব্যবস্থা, যা মানব-প্রকৃতির অনুকূল, কল্যাণমুখী ও চিরস্থায়ী শান্তির নিশ্চয়তাদানকারী।
তারা যে পথেই আসুক না কেন— বিজ্ঞানের নাম নিয়ে হোক, দর্শনের আড়ালে হোক, কিংবা সভ্যতার মোড়কে—
কুরআন প্রতিটি পথে প্রস্তুত রেখেছে তার প্রতিরক্ষা, এবং দিয়েছে তারচেয়েও শ্রেষ্ঠ বিকল্প।
এ কারণেই কুরআন নিজেই ঘোষণা করেছে—
{وجَاهِدْهُم بِهِ جِهَادًا كَبِيرًا}
“তুমি তাদের সঙ্গে কুরআনের সাহায্যে প্রবল সংগ্রাম চালিয়ে যাও”
(সূরা আল-ফুরকান: ৫২)
এই আয়াত যেন এক চিরন্তন আহ্বান—চিন্তার ময়দানে, দর্শনের সংঘাতে, সভ্যতার দ্বন্দ্বে—সর্বশ্রেষ্ঠ অস্ত্র হচ্ছে কুরআনই, যার আলোতে মিথ্যা গলে যায়, আর সত্য প্রতিষ্ঠিত হয় অটল ও অবিনাশী শক্তিতে।
কুরআনের এই মহান আহ্বান পূরণ করতে হলে অপরিহার্য হলো—কুরআনকে গভীরভাবে অনুধাবন করা, নতুন দৃষ্টিতে দেখা, এবং তার হাকায়িক ও আফকার উন্মচোন করা।
এই উপলব্ধিই এ অধমকে ব্যাকুল করে তোলে—কুরআনের আহ্বান যেন অন্তরের গভীরে আলোড়ন তোলে, হৃদয়কে অস্থির করে দেয়।
একদিকে উম্মাহর জাগ্রত প্রয়োজন, অন্যদিকে কুরআনের সেই আহ্বান—এই দুই স্রোতের মিলনেই জন্ম নেয় এক অদম্য তাগিদ; যা এই অযোগ্য, অক্ষম বান্দাকে তাড়িত করে আফকারে কুরআন নিয়ে কাজ করতে।
কাজটি নিঃসন্দেহে জটিল, দায়িত্বের ভার ভারী, আর যোগ্যতার তুলনায় আমি কিছুই নই। তবু আশা রাখি—আকাবির ও সালাফের আশ্রয়ে, তাদের দোয়া ও দিকনির্দেশনার ছায়ায়, এই পথের সূচনা যেন সঠিকভাবে করতে পারি। আল্লাহই ভরসা; আল্লাহই তাওফীকদাতা।